ভারতের দম্ভ মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে ১৫০ ক্রিকেট ইতিহাসে বিশ্বরেকর্ড গড়লো আয়ারল্যান্ড



পূর্ণশক্তির ভারতকে হারিয়ে আয়ারল্যান্ডের ঐতিহাসিক জয়

অভিষেক শর্মার ঝড়ো ফিফটিও বাঁচাতে পারল না ভারতকে; দলগত নৈপুণ্যে ৩৪ রানের দাপুটে জয় তুলে নিল আয়ারল্যান্ড।


বেলফাস্টে অন্যতম বড় অঘটনের জন্ম দিল আয়ারল্যান্ড। ১৮৩ রানের লক্ষ্য ছুড়ে দিয়ে তারা শক্তিশালী ভারতকে গুটিয়ে দিল মাত্র ১৪৮ রানে। ফলে ৩৪ রানের দাপুটে জয়ে সিরিজে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করল আইরিশরা। স্কোরলাইন যতটা সহজ দেখাচ্ছে, ম্যাচটা আসলে তার চেয়েও বেশি নাটকীয় ছিল। বিশেষ করে ভারতের ব্যাটিং ধস ছিল একেবারে অপ্রত্যাশিত।


শুরুতে ব্যাট করতে নেমে আয়ারল্যান্ডের ইনিংসটা খুব একটা স্থির ছিল না। মাত্র ৩০ রানেই তারা হারিয়ে ফেলে তিন উইকেট। টিম টেক্টর, রস অ্যাডায়ার এবং হ্যারি টেক্টর দ্রুত ফিরে গেলে ভারত ম্যাচে স্পষ্ট আধিপত্য তৈরি করেছিল।


বিশেষ করে হার্শিত রানা নতুন বলে দুর্দান্ত বোলিং করেন। তার গতি ও শর্ট বল সামলাতে গিয়ে আইরিশ টপ অর্ডার চাপে পড়ে যায়। চার ওভারে মাত্র ২৪ রান দিয়ে তিন উইকেট তুলে নিয়ে তিনি ভারতের সেরা বোলার ছিলেন।

তবে এরপর ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন লরকান টাকার ও গ্যারেথ ডেলানি। টাকারের ৩৬ বলে ৫০ রানের ইনিংসটি ছিল অত্যন্ত পরিণত। শুরুতে সময় নিয়ে পরে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করেন তিনি। অন্যদিকে ডেলানির ৩২ বলে ৪৯ রানের ইনিংস ভারতীয় বোলারদের পুরো ছন্দ নষ্ট করে দেয়। দুজন মিলে মধ্য ওভারে রানরেট বাড়িয়ে দেন দ্রুত।


শেষদিকে জর্জ ডকরেল ১০ বলে ১৯ রানের কার্যকর ক্যামিও খেলেন। ফলে শেষ পাঁচ ওভারে আয়ারল্যান্ড তোলে গুরুত্বপূর্ণ রান। ২০ ওভারে ১৮২/৯ পুঁজি পায় আয়ারল্যান্ড।


ভারতের হয়ে আর্শদীপ সিং দুটি এবং অক্ষর প্যাটেল দুটি উইকেট নিলেও সবচেয়ে হতাশ করেছেন প্রসিধ কৃষ্ণা। চার ওভারে ৫৭ রান খরচ করে তিনি ম্যাচের গতি পুরো আয়ারল্যান্ডের দিকে ঠেলে দেন। এছাড়া ওয়াশিংটন সুন্দর এক ওভারেই ১৯ রান দিয়ে চাপ আরও বাড়ান।


১৮৩ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ভারতের শুরুটা ছিল আগুনঝরা। অভিষেক শর্মা মাত্র ২০ বলে ফিফটি করে ম্যাচকে ভারতের নিয়ন্ত্রণে এনে দিয়েছিলেন। তার ইনিংসে ছিল ৭টি চার ও ২টি ছক্কা। পাওয়ারপ্লেতে ভারত খুব সহজেই রান তুলছিল। মনে হচ্ছিল ম্যাচ দ্রুত ভারতের হাতেই চলে যাবে।

কিন্তু অন্য প্রান্তে নিয়মিত উইকেট পড়তে থাকে। সঞ্জু স্যামসন মাত্র ৫ রান করে আউট হন। ইশান কিশান ও শ্রেয়াস আইয়ার চরম ব্যর্থ হন। বিশেষ করে আইয়ারের ধীরগতির ৩ রান ভারতের ওপর চাপ বাড়িয়ে দেয়।


অভিষেক শর্মা আউট হওয়ার পর ভারতের ব্যাটিং একেবারে ভেঙে পড়ে। তিলক ভার্মা ১৯ রান করলেও ইনিংস বড় করতে পারেননি। শিভম দুবে কিছুটা লড়াইয়ের চেষ্টা করেছিলেন। ১৪ বলে ২৫ রানের ইনিংসে তিনি ম্যাচে ফেরার আশা জাগিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর আউট হওয়ার পরই ভারতের শেষ আশা নিভে যায়।


আয়ারল্যান্ডের বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে সফল ছিলেন ম্যাট হলার্ড। চার ওভারে ২৮ রান দিয়ে তিন উইকেট নিয়ে তিনি ভারতের মিডল অর্ডার ধসিয়ে দেন। জাই মুনদ্রাও অসাধারণ নিয়ন্ত্রিত বোলিং করেন। তিনি দুই গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচে ভারতের প্রত্যাবর্তনের পথ বন্ধ করে দেন। এছাড়া ম্যাথিউ হামফ্রিজ শেষদিকে গুরুত্বপূর্ণ দুই উইকেট নিয়ে জয় নিশ্চিত করেন।

ভারতের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল পার্টনারশিপ গড়তে না পারা। একমাত্র অভিষেক ছাড়া আর কোনো ব্যাটার ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেননি। টপ অর্ডারের ব্যর্থতা, মিডল অর্ডারের অস্থিরতা এবং প্রয়োজনের সময় বড় শট খেলতে না পারার কারণেই ম্যাচ হাতছাড়া হয়েছে।


অন্যদিকে আয়ারল্যান্ড দল হিসেবে অনেক বেশি সংগঠিত ক্রিকেট খেলেছে। ব্যাটিংয়ে মাঝের ওভারে ঘুরে দাঁড়ানো, শেষদিকে দ্রুত রান তোলা এবং পরে পরিকল্পিত বোলিং—সব মিলিয়ে তারা পুরো ম্যাচেই অধিক আত্মবিশ্বাসী ছিল। বিশেষ করে ফিল্ডিং ও ক্যাচিংয়ে আইরিশদের তীক্ষ্ণতা চোখে পড়ার মতো ছিল।


সব মিলিয়ে এটি ছিল আয়ারল্যান্ডের জন্য স্মরণীয় এক জয় এবং ভারতের জন্য বড় সতর্কবার্তা। টি-টোয়েন্টিতে ছোট দল বলে কাউকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ আর নেই—বেলফাস্টে সেই বাস্তবতাই আবারও স্পষ্ট হয়ে গেল।


No comments

Powered by Blogger.